বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ, বরিশাল : বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহকে (খোকন সেরনিয়াবাত) মনোনয়ন দেওয়ার পরপরই রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠে দলের একটি অংশ। যারা বরিশাল সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র বিরোধী হিসেবে পরিচিত। মনোনয়ন বোর্ডের সভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে বাদ দিয়ে তাঁরই চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহকে (খোকন সেরনিয়াবাত) মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরফলে ধীরে ধীরে পাল্টে যায় বরিশাল আওয়ামী লীগের রাজনীতির দৃশ্যপট। সাদিক বিরোধীদের হাতে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। বিপরীতদিকে রাজপথ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় সাদিক অনুসারীরা।
গত ১৫ এপ্রিল খোকন সেরনিয়াবাতকে মনোনয়নের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাদিক বিরোধীরা বরিশালের রাজপথে আনন্দ মিছিল বের করেন।

গত ২০ এপ্রিল সাদিক বিরোধী আওয়ামী লীগের একটি অংশ খোকন সেরনিয়াবাতকে স্বাগত জানিয়ে বরিশাল নগরে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা মঞ্চে নিয়ে আসেন। মূলত: এরপর থেকে ধীরে ধীরে রাজপথের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় সাদিক বিরোধীদের হাতে।

বিশেষ করে নৌকার কর্মী-সমর্থকদের মারধরের ঘটনায় সাদিকের আস্থাভাজন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক রইজ আহমেদ মান্নাসহ তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। সহযোগীদের নিয়ে কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি মান্নার নিয়ন্ত্রণে থাকা মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিকেও বিলুপ্ত করে দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। মান্নাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সাদিক অনুসারীদের মাঝে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অবশ্য মান্নাকে গ্রেপ্তারের বিষয় নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
১৪ মে সন্ধ্যারাতে নগরীর ২ নং ওয়ার্ডের কাউনিয়া এলাকা থেকে ছাত্রলীগ নেতা মান্নার বিরুদ্ধে বরিশাল সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকার প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ’র (খোকন সেরনিয়াবাত) কর্মীকে পিস্তল ঠেকিয়ে মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠে। বিষয়টি নগরজুড়ে চাউর হয়ে গেলে ওইদিন মধ্যরাতে মান্নাসহ কয়েক কর্মীকে আটক করে পুলিশ। ওই মামলায় সোমবার (১৫ মে) আদালত ছাত্রলীগ নেতা মান্না এবং তাঁর অনুসারীদের কারাগারে প্রেরণ করেন। কারাগারে পাঠানো মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- রইজ আহম্মেদ মান্না, তার ছোট ভাই রিসাদ আহমেদ নাদিম, মেহেদী হাসান সম্পদ, পারভেজ হাওলাদার, শান্ত ইসলাম, মামুন ওরফে কসাই মামুন, মিজানুর রহমান শাওন, রাশেদ হাওলাদার, আল আমিন হাওলাদার, নান্টু সন্যামত, ইমরান হোসেন সজিব, মো. আজিজুল হাকিম ফাহিম, মো. সুমন ওরফে টিয়া সুমন।

যদিও মান্না এই হামলার সঙ্গে জড়িত নয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এবং তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। মান্না হামলার কথা অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। গত ৫ দিন ধরে তিনি সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত রয়েছেন। ঘটনার সময়ের সিসি ক্যামেরা চেক করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

১৫ মে দুপুর ১২টায় বরিশাল নগরীর সোহেল চত্বরস্থ দলীয় কার্যালয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রইজ আহম্মেদ মান্নার মুক্তি দাবি করা হয়। বলা হচ্ছে- একটা বিশেষ গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে এখানে। আমাদের প্রাণের নেতা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক অভিভাবক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র ছোট ভাই খোকন সেরনিয়াবাতের নমিনেশনকে কেন্দ্র করে এ নির্বাচনকে অভ্যন্তরীণ একটি মহল বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে।
নগর আ’লীগের নেতৃবৃন্দ বলছেন-পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রইজ আহম্মেদ মান্নাকে গ্রেপ্তার করার যে কারণ দেখিয়েছে, যেখানে ঘটনাস্থলের দুই কিলোমিটারের মধ্যেই রইজ আহম্মেদ মান্না ছিল না। এমনকি এ ঘটনা সম্পর্কিত কোনো ভিডিও ফুটেজও কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। আমরা বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে, উল্লেখিত ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করার।
সংবাদ সন্মেলনে বলা হয়-বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ আমরা ঐক্যবদ্ধ, আওয়ামী লীগের প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে আমরা বিভিন্নভাবে কাজ করছি, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক বরাদ্দের পর আমাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নিয়ে ৩০টি ওয়ার্ডে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনা করবো। আজকে নৌকা বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন নয়। আবারও বলছি আমরা আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ, আমাদের প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত। মনোনয়নবোর্ড সুন্দর একটি মানুষকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দিয়ে বরিশালের মানুষের কাছে তুলে ধরছেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, একটা বিশেষ গোষ্ঠীর ইন্ধনে রয়েছে এখানে। আমাদের প্রাণের নেতা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক অভিভাবক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র ছোট ভাই খোকন সেরনিয়াবাতের নমিনেশনকে কেন্দ্র করে এ নির্বাচনকে অভ্যন্তরীণ একটি মহল বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে। তবে কাদের ইন্ধনে এমনটি হচ্ছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, আপনারা সবই জানেন।
এ সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের একাংশের অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ কিনা জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর তিনজন কর্মী হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছে। যারা হামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আহতদের পরিবার মামলা করেছে। যে মামলার বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করেছে। পুলিশ যেটির তদন্ত করে সেটির বিষয়ে ওনারা সংবাদ সম্মেলন করে কিভাবে সেটি আমরা বুঝতে পারছি না। ওনারা কি এজেন্ডা দিতে চায়, কি বার্তা দিতে সেটা তাদের প্রশ্ন করুন। তিনি বলেন, তারা এ সংবাদ সম্মেলন করে কি এজেন্ডা দিতে চায় সেটা আমরা বুঝতেছি না, প্রধানমন্ত্রী নৌকার প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছেন। প্রার্থী দেওয়ার পর তারা নৌকার পক্ষে কাজ করবেন এটিই বাস্তব কিন্তু তারা এভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে যারা নৌকার কর্মীদের আঘাত করলো, আহত করলো, পিস্তল ধরার মতো অপকর্ম করলো তাদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে সাফাই গাওয়া কেন বুঝতে পারিনি আমরা। আর সাফাই গেয়ে নৌকার পক্ষে না বিপক্ষে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় সেটি দেখার জন্য হাইকমান্ড রয়েছে এবং বরিশালের জনগণও আছে।

আসন্ন সিটি নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার (২৬ মে) বিশেষ বর্ধিত সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আব্দুল্লাহকে দেখা মিলেনি। তবে তাঁর বাবা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ এমপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, সাদিক এখানে মেয়র ছিলো, তাঁর কিছু অনুসারী বা ভক্ত আছেন, যাদের মনে হয়তো কষ্ট লাগছে। কিন্তু আমাদের এই কষ্ট ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যেকোনভাবে হোক খোকন সেরনিয়াবাতকে জয়ী করাতে হবে এবং শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। আজকে যদি আমাদের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হয়, তাহলে এই বরিশালে দল, মত, নির্বিশেষে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে খোকন সেরনিয়াবাতের নৌকায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সেই নির্বাচন আমরা করবো। ইনশা-আল্লাহ আপনারা সবাই আমাকে সহযোগীতা করবেন।
বিশেষ বর্ধিত সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বরিশাল সিটি নির্বাচনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা টিমের সমন্বয়ক আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ঢাকায় থেকেই এখানকার সিটি নির্বাচনে সার্বিক সহযোগিতা করবেন। আর এটিই দলীয় সিদ্ধান্ত।
উল্লেখ্য : আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোট কেন্দ্র ১২৩টি। মোট ভোটার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৪০৭ জন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply